কিডনি আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর প্রধান কাজ রক্ত পরিশোধন করে বর্জ্য পদার্থ এবং অতিরিক্ত পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া। পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা, লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সাহায্যকারী হরমোন (ইরিথ্রোপয়েটিন) নিঃসরণ এবং ভিটামিন ডি সক্রিয়করণ করে। যখন কিডনির কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে কিডনি ফেইলিওর বা কিডনি বিকল বলা হয়। এটি দু’ধরনের হতে পারে:
- অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (AKI): হঠাৎ করে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। সাধারণত সংক্রমণ, ডিহাইড্রেশন বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হয়। সময়মতো চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রে সেরে ওঠে।
- ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD): ধীরে ধীরে কিডনির ক্ষতি হয়, যা ৫টি স্টেজে বিভক্ত। চূড়ান্ত স্টেজে (ESRD) ডায়ালাইসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া বাঁচা কঠিন।
বাংলাদেশে CKD-এর প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ CKD-এর বিভিন্ন স্টেজে আছেন। সময়মতো সচেতনতা না থাকলে এটি জীবনঘাতী হয়ে ওঠে। নিচে কিডনি বিকলের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া
কিডনি বিকলের প্রধান কারণসমূহ
কিডনি বিকলের পিছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো:
- ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি) উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালী (গ্লোমেরুলাস) ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি CKD-এর ৪০-৫০% কেসের কারণ। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে কিডনি সমস্যাও বাড়ছে।
- উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালীতে চাপ সৃষ্টি করে ক্ষতি করে। এটি CKD-এর দ্বিতীয় প্রধান কারণ (২৫-৩০% কেস)।
- গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস কিডনির ফিল্টারিং ইউনিটে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা সংক্রমণ (স্ট্রেপটোকক্কাল) বা অটোইমিউন রোগের কারণে হতে পারে।
- পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ বংশগত রোগ, যেখানে কিডনিতে অসংখ্য সিস্ট জন্মায় এবং কার্যক্ষমতা নষ্ট করে।
- কিডনিতে পাথর বা বাধা দীর্ঘদিন পাথর থাকলে বা প্রোস্টেট বৃদ্ধির কারণে প্রস্রাবের পথ বন্ধ হলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের অপব্যবহার অতিরিক্ত ব্যথানাশক (যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক), অ্যান্টিবায়োটিক বা কনট্রাস্ট ডাই কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
- অন্যান্য কারণ সংক্রমণ (পাইলোনেফ্রাইটিস), লুপাস, ক্যান্সার, অতিরিক্ত অ্যালকোহল, ধূমপান, স্থূলতা এবং ডিহাইড্রেশন।

কিডনি বিকলের লক্ষণসমূহ
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ খুব কম দেখা যায়, যা “সাইলেন্ট কিলার” নামে পরিচিত। উন্নত পর্যায়ে নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: অ্যানিমিয়া এবং টক্সিন জমার কারণে।
- ইডিমা বা ফোলা ভাব: পা, গোড়ালি, হাত বা মুখ ফুলে যাওয়া।
- প্রস্রাবের পরিবর্তন: ফেনাযুক্ত প্রস্রাব (প্রোটিনুরিয়া), রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব, পরিমাণ কমে যাওয়া বা রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব।
- বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া: ইউরেমিয়ার কারণে।
- শ্বাসকষ্ট: ফুসফুসে তরল জমা (পালমোনারি ইডিমা)।
- ত্বকে চুলকানি, পেশিতে খিল ধরা: ফসফেট জমার কারণে।
- উচ্চ রক্তচাপ যা নিয়ন্ত্রণে আসে না।
- মাথা ঘোরা, মনোযোগের অভাব, খিঁচুনি: ইউরেমিক এনসেফালোপ্যাথি।

কিডনি বিকল প্রতিরোধের উপায়
কিডনি বিকলের বেশিরভাগ কারণই জীবনধারা-সম্পর্কিত। তাই প্রতিরোধ সম্ভব:
- ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ পরীক্ষা করুন। HbA1c ৭% এর নিচে রাখুন।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস লবণ কমান (দিনে ৫ গ্রামের কম), প্রোটিন নিয়ন্ত্রিত রাখুন। ফল, শাকসবজি, আস্ত শস্য বেশি খান। পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার (কলা, আলু) সীমিত করুন যদি কিডনি সমস্যা থাকে।
- পর্যাপ্ত পানি পান দিনে ২-৩ লিটার জল খান (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে)।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়াম BMI ২৫ এর নিচে রাখুন। দিনে ৩০ মিনিট হাঁটা বা যোগা করুন।
- ধূমপান ও অ্যালকোহল ত্যাগ এগুলো রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- ওষুধের সতর্ক ব্যবহার ব্যথানাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বছরে অন্তত একবার সিরাম ক্রিয়েটিনিন, eGFR, ইউরিন অ্যালবুমিন পরীক্ষা করান। ৪০ বছরের পর বা ডায়াবেটিস/উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বেশি সতর্ক থাকুন।
কিডনি বিকলের চিকিৎসা
- প্রাথমিক পর্যায়ে: কারণ অনুসারে চিকিৎসা—ডায়াবেটিস/রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়েট, ওষুধ (যেমন ACE ইনহিবিটর)।
- উন্নত পর্যায়ে:
- ডায়ালাইসিস: হেমোডায়ালাইসিস (সপ্তাহে ৩ বার) বা পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (ঘরে করা যায়)।
- কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট: সবচেয়ে কার্যকর, কিন্তু ডোনারের অভাব এবং খরচ বেশি।
- সহায়ক চিকিৎসা: অ্যানিমিয়ার জন্য ইপোয়েটিন ইনজেকশন, হাড়ের সমস্যার জন্য ভিটামিন ডি।
কিডনি বিকল একটি নীরব ঘাতক। প্রাথমিক লক্ষণ উপেক্ষা করলে চিকিৎসা জটিল এবং খরচবহুল হয়ে যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সক্রিয় জীবনযাপন কিডনিকে সুস্থ রাখতে পারে। যদি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে নেফ্রোলজিস্টের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। সচেতনতাই কিডনি বিকল প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
