সুজাইম (Suzyme) একটি জনপ্রিয় ডাইজেস্টিভ এনজাইম সাপ্লিমেন্ট, যা প্যানক্রিয়াটিনের উপাদান দিয়ে তৈরি। এটি পাকস্থলী ও অন্ত্রে খাবার হজমে সাহায্য করে, বিশেষ করে যখন প্যানক্রিয়াস থেকে প্রাকৃতিক এনজাইমের নিঃসরণ কমে যায়। বাংলাদেশে এটি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উৎপাদিত একটি ওষুধ হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রবন্ধে সুজাইমের উপাদান, কাজের প্রক্রিয়া, ব্যবহার, ডোজ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সতর্কতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে ওষুধ সেবন করুন।
Suzyme সুজাইম ওষুধের যাবতীয় তথ্য
সুজাইমের উপাদান (Composition):
সুজাইম প্রতিটি এন্টেরিক কোটেড ট্যাবলেটে থাকে প্যানক্রিয়াটিন ৩২৫ মি.গ্রা. বিপি। প্যানক্রিয়াটিন একটি প্রাকৃতিক এনজাইম মিশ্রণ, যা শূকরের প্যানক্রিয়াস থেকে নিষ্কাশিত হয়। এতে তিনটি প্রধান এনজাইম থাকে:
- প্রোটিয়েজ (Protease): প্রোটিন হজম করে (কার্যক্ষমতা: ১৪০০ FIP ইউনিট/গ্রাম)।
- লাইপেজ (Lipase): চর্বি হজম করে (কার্যক্ষমতা: ২০,০০০ FIP ইউনিট/গ্রাম)।
- এমাইলেজ (Amylase): কার্বোহাইড্রেট (স্টার্চ) হজম করে (কার্যক্ষমতা: ২৪,০০০ FIP ইউনিট/গ্রাম)।
এন্টেরিক কোটিং থাকায় ট্যাবলেট পাকস্থলীর অ্যাসিডে না ভেঙে অন্ত্রে গিয়ে এনজাইম মুক্ত করে।

সুজাইমের কাজের প্রক্রিয়া (Mechanism of Action):
প্যানক্রিয়াস থেকে প্রাকৃতিকভাবে এই এনজাইমগুলো নিঃসৃত হয়। কিন্তু কিছু রোগে (যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস, ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস) এনজাইমের অভাব হয়। ফলে খাবার ঠিকমতো হজম হয় না, পুষ্টি শোষণ কমে এবং মলত্যাগে অস্বস্তি হয়। সুজাইম এই অভাব পূরণ করে খাবার হজমে সাহায্য করে।

ব্যবহারের নির্দেশনা (Indications):
সুজাইম নিম্নলিখিত অবস্থায় ব্যবহৃত হয়:
- সিস্টিক ফাইব্রোসিস (শিশুদের মধ্যে সাধারণ)।
- ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস (দীর্ঘস্থায়ী প্যানক্রিয়াসের প্রদাহ)।
- প্যানক্রিয়াস অপসারণের পর (প্যানক্রিয়াটেকটমি)।
- পাকস্থলী অপসারণের পর (গ্যাস্ট্রেকটমি)।
- স্টিয়াটোরিয়া (চর্বিযুক্ত মল)।
- সিলিয়াক ডিজিজ বা গ্লুটেন অসহিষ্ণুতা।
- সোমাটোস্ট্যাটিনোমা (দুর্লভ টিউমার)।
- বয়স্কদের মধ্যে প্যানক্রিয়াটিক এনজাইমের অভাবজনিত হজমের সমস্যা।

সেবন মাত্রা ও প্রয়োগবিধি (Dosage and Administration):
- প্রাপ্তবয়স্ক: প্রতিদিন ১-৩টি ট্যাবলেট, খাবারের সঙ্গে বা খাবারের পরপরই।
- শিশু: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে, শরীরের ওজন ও অবস্থা বিবেচনায়।
- ট্যাবলেট চিবিয়ে বা ভেঙে খাবেন না—গোটা গিলে খান।
- খাবারের সঙ্গে প্রচুর পানি পান করুন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Side Effects):
সাধারণত নিরাপদ, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে:
- মুখে বা পায়ুপথে ঘা (বিশেষ করে শিশুদের উচ্চ ডোজে)।
- অ্যালার্জি: হাঁচি, চোখ দিয়ে পানি পড়া, ত্বকে ফুসকুড়ি।
- পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য।
- অত্যধিক ডোজে হাইপারইউরিকেমিয়া (রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বাড়া)।
অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া (Drug Interactions):
- অ্যান্টাসিড বা ক্ষারীয় ওষুধের সঙ্গে একসঙ্গে খাবেন না—এন্টেরিক কোটিং ভেঙে যেতে পারে।
- আয়রন সাপ্লিমেন্টের শোষণ কমাতে পারে।
মাত্রাধিক্যের লক্ষণ (Overdose):
- ডায়রিয়া বা পেট খারাপ।
- খুব উচ্চ ডোজে রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বাড়তে পারে।
- সিস্টেমিক বিষক্রিয়া সাধারণত হয় না।
গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে ব্যবহার:
- প্রেগন্যান্সি ক্যাটাগরি C: প্রাণীতে ক্ষতির প্রমাণ আছে, মানুষে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না।
- স্তন্যদান: দুধে নিঃসরণ হয় কিনা জানা নেই। সতর্কতার সাথে ব্যবহার করুন।
সতর্কতা ও Contraindication:
- প্যানক্রিয়াটিনের প্রতি অ্যালার্জি থাকলে ব্যবহার করবেন না।
- অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে ব্যবহার নিষিদ্ধ।
- শিশুদের উচ্চ ডোজে মুখে ঘা হতে পারে।
- দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন।
সংরক্ষণ ও সরবরাহ:
- শীতল ও শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করুন।
- সরবরাহ: প্রতি বক্সে ১০০টি এন্টেরিক কোটেড ট্যাবলেট (১০টি স্ট্রিপে)।
- মূল্য: বাংলাদেশে প্রতি স্ট্রিপ (১০টি) প্রায় ৮০-১০০ টাকা (২০২৫ অনুসারে, ফার্মেসি ভেদে ভিন্ন হতে পারে)।
সুজাইম হজমশক্তি বাড়াতে এবং প্যানক্রিয়াটিক এনজাইমের অভাব পূরণে কার্যকর একটি ওষুধ। তবে এটি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার করবেন না। হজমের সমস্যা থাকলে প্রথমে কারণ নির্ণয় করান। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান।
